রোদ-বৃষ্টি-গরমে ভ্যান চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে সাতক্ষীরার আশাশুনির মহেশ্বরকাটির শহিদুল, আমজেদ, এবাদুল ও আনিসুরের জন্য। তবে জীবন তো আর থেমে থাকে না। তাই ভ্যানের হ্যান্ডেল ছেড়ে তারা এখন নেমে পড়েছেন মৎস্য ঘেরে। ঘেরে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো শ্যাওলা সংগ্রহ ও বিক্রি করে এখন সচল রাখছেন সংসারের চাকা। শুধু এই ভ্যানচালকরাই নন, সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার কোদন্ডা এলাকার বহু প্রান্তিক নারীও এখন শ্যাওলা কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। স্থানীয় মহেশ্বরকাটি থেকে আশাশুনি যাওয়ার পথে চোখে পড়ে শ্যাওলা সংগ্রহের এই ভিন্নধর্মী ও ব্যস্ত দৃশ্য।
সেখানে দেখা যায়, কেউ ঘেরের পানিতে ডুব দিয়ে শ্যাওলা বাছাই করে নৌকায় তুলছেন, কেউ টেনে রাস্তায় ফেলছেন, আবার কেউ তা ভ্যানে লোড করছেন। এখানে ৫ শতাধিক পরিবারের হাজারো সদস্য এই উপার্জনের সঙ্গে জড়িত রয়েছে।
পথে কথা হয় ভ্যানচালক শহিদুলের সঙ্গে। তিনি বলেন, “এই তীব্র গরমে আমরা শ্যাওলা বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছি। বড় বড় মৎস্য ঘের থেকে শ্যাওলা সংগ্রহ করে অন্য ঘের মালিকদের কাছে প্রতি ভ্যান ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করি। এই আয়েই আমাদের সংসার চলে।”
পাশে থাকা আমজেদ ও এবাদুল জানান, “তারা দলবদ্ধভাবে প্রতিদিন বিভিন্ন ঘের থেকে শ্যাওলা সংগ্রহ করে মিষ্টি জলের ঘের এলাকায় নিয়ে যান। সেখানে প্রতি গাড়ি শ্যাওলা ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়, যা দিয়ে তাদের পরিবারের ভরণপোষণ চলছে।”
পুরুষদের পাশাপাশি এই শ্যাওলাকে কেন্দ্র করে কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে স্থানীয় নারীদেরও। কোদন্ডা এলাকার বেশ কিছু নারী প্রতিদিন ভোর হতেই ছোট ডিঙি নৌকা নিয়ে নেমে পড়েন ঘেরে। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত একটানা ৫ ঘণ্টা কাজ করে তারা ঘেরের মাঝে শ্যাওলার স্তূপ তৈরি করেন।
তবে এই কঠোর পরিশ্রমের পরও মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন তারা। লক্ষ্মী, শেফালী ও ফিরোজারা আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা ৫ ঘণ্টা শ্যাওলা বাছাই করে মজুরি পাই মাত্র ২২০ টাকা। অথচ একই সময়ে একই শ্রম দিয়ে পুরুষরা পাচ্ছেন ৩৫০ টাকা। একই কাজ ও সমপরিমাণ শ্রম দেওয়া সত্ত্বেও আমাদের বেলায় মজুরি কম। তারপরও পেটের দায়ে এই কম টাকাতেই কাজ করতে হচ্ছে।”
শ্যাওলার ব্যবহার সম্পর্কে শ্রমিক ও ঘের মালিক সুদয় কুমার মণ্ডল জানান, “এই শ্যাওলা ঘেরে মূলত মাছের সম্পূরক খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ঘেরে এই শ্যাওলা পচে গেলে তা খেয়ে বাগদা চিংড়ি ও সাদা পোনা দ্রুত মোটাতাজা হয়, যা ঘের মালিকদের লাভবান করে তোলে।
আশাশুনি উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, এ উপজেলায় মোট বাগদা চিংড়ি ঘেরের সংখ্যা ১৩,১৭৯টি (আয়তন: ১৭,৩৯৭ হেক্টর), যেখান থেকে উৎপাদন হয় ৫,৬২০.৮ মেট্রিক টন। আর বাগদা চাষির সংখ্যা ১২,৭৪৮ জন। গলদা চিংড়ি ঘেরের সংখ্যা ৮১৯টি (আয়তন: ৮১২ হেক্টর), যেখান থেকে উৎপাদন হয় ৫৬৬ মেট্রিক টন এবং মোট গলদা চাষির সংখ্যা ৬৬৯ জন। এ ছাড়া সাদা মাছের মোট পুকুরের সংখ্যা ১০,০১০টি (আয়তন: ৯৯০ হেক্টর), যেখান থেকে উৎপাদন আসে ৫,৪৪৬ মেট্রিক টন।
আশাশুনি সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা উজ্জ্বল কুমার অধিকারী বলেন, “ঘেরে পানির গভীরতা কম থাকার কারণে এবং সূর্যের আলো সরাসরি তলদেশের মাটিতে পৌঁছানোর ফলে এই শ্যাওলা বা উদ্ভিদের জন্ম হয়। মৎস্য বা চিংড়ি চাষের ক্ষেত্রে সাধারণত এই শ্যাওলার কোনো প্রয়োজন হয় না। তবে তীব্র গরমের সময় শ্যাওলার নিচের পানি তুলনামূলক ঠান্ডা থাকায় এটি মাছের আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। তা ছাড়া, এই শ্যাওলার গায়ে এক ধরনের ছোট ছোট পোকামাকড় আশ্রয় নেয়, যা চিংড়িসহ অন্যান্য মাছের খাদ্য। সবুজ শ্যাওলা হওয়ার কারণে রুই এবং বিশেষ করে গ্রাস কার্প জাতীয় সাদা মাছ সরাসরি এই শ্যাওলা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।”
খুলনা গেজেট/এনএম

